অনলাইন ক্লাস ও বাস্তবতা

জহিরুল ইসলাম

ইউজিসির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশের সকল পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে।কিছু মহল এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছে আবার কিছু মহল এটাকে “বিলাসিতা” বলে আখ্যায়িত করেছে।

অনলাইন ক্লাসকে সাধুবাদ জানানো মহলের যুক্তি বিশ্ব মহামারী করোনা ভাইরাসের কারনে দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সেশনজটে পড়ে গেছে।এখন থেকে নিয়মিত অনলাইন ক্লাস হলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। তাদের কথার সাথে আমিও একমত।কারন করোনার জন্য দেশের কোনো কিছুই যেহেতু থেমে নেই, লেখাপড়া কেন থেমে থাকবে?

কিন্তু বাস্তবতা কি বলছে?? আমরা যদি একটু পয়েন্ট আকারে আলোচনা করিঃ
১.বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাক্সিমাম শিক্ষার্থীদের স্মার্ট ফোন আছে।কিন্তু কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীর স্মার্ট ফোন নেই, তারা কিভাবে ক্লাস করবে??

২. বাংলাদেশের প্রায় ৮০% মানুষ গ্রামে বাস করে।আর পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী গ্রামের এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের।গ্রামে এখনো নেটের স্পীড খুবই দুর্বল। ক্লাস করতে হলে ঘরের বাইরে রাস্তায় বা খোলা মাঠে বা নদীর কুলে গিয়ে বসতে হয়।বাস্তবে এভাবে ক্লাস করা সম্ভব না।

৩. যাদের স্মার্ট ফোন আছে এবং এলাকায় নেট স্পীড মোটামুটি ভাল তাদেরও একটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সেটা হচ্ছে চড়া দামে ডেটা প্যাক কেনা।ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা টিউশন করিয়ে নিজের খরচ চালাতো এবং পাশাপাশি পরিবারেও সামান্য সাহায্য করতো।বর্তমান টিউশন বন্ধ থাকায় পরিবারকে তো সাহায্য করতে পারছেই না, উল্টো বাড়িতে এসে তাদের বোঝা হয়ে বসে আছে।এমতাবস্থায় চড়া দামে ডেটা প্যাক কিনে ক্লাস করা যেন তাদের কাছে “মরার উপর খাড়ার ঘা” হয়ে দাড়িয়েছে।

এত বাধা অতিক্রম করেও দেখা যাচ্ছে ৫০-৬০% শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে জয়েন হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে অনলাইন ক্লাস কি আসলেই সবাই সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হচ্ছে??কারন নেট অন করে ক্লাসে জয়েন দিলেও যদি কোনো বন্ধু মেসেঞ্জারে মেসেজ করে তাহলে মনযোগ সেদিকে চলে যায়।এদিকে টিচার নিজের মত করে রিডিং দিয়ে নেক্সট স্লাইডে চলে যাচ্ছেন।তার পরেও যদি কেউ মনযোগ ধরে রাখে,তাহলে কি সে সম্পুর্ণ বুঝতে সক্ষম হবে? সব বিষয় বুঝতে পারলেও ম্যাথ এবং কেমিস্ট্রির রিয়াকশন ম্যাকানিজম কিভাবে স্লাইডের মাধ্যমে বুঝবে?

সবশেষে বলতে চাই প্রশাসন যে অর্ধেক শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছে বাকিদের কথা কি ভেবে দেখেছেন তারা?যারা ক্লাস করছে তারা কিছুটা হলেও ধারনা পাচ্ছে।কিন্তু যারা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার জন্য ক্লাস করতে পারছেনা তাদের কথা কি প্রশাসনের ভাবা উচিত না? প্রশাসন এই দুই শ্রেণির মাঝে কি একটা মেধার বৈষম্য তৈরি করছেনা?

কারন, অনলাইন ক্লাসে যেসব টপিক শেষ করা হচ্ছে, ক্যাম্পাস খোলার পর যদি আবার সেগুলো রিপিট না করে, তাহলে আজ যারা ক্লাস করছে এবং যারা করতে ব্যর্থ হচ্ছে এই দুইয়ের মধ্য একটা বৈষম্য অবশ্যই তৈরি হবে। আবার যদি ঐ টপিক রিপিট করেও থাকেন, তাহলেও বৈষম্য তৈরি হবে।কারন, এখন যারা ক্লাস করছে তারা একই টপিক দুইবার বুঝবে আর যারা ক্লাস করতে পারছেনা তারা একবার।এখানেও চরম বৈষম্য হবে।

এজন্য আমরা বলতেই পারি অনলাইন ক্লাস সামর্থবান ও সামর্থ্যহীন শিক্ষার্থীদের মাঝে একটা মেধার বৈষম্য তৈরি করে দিচ্ছে যেতা মোটেও কাম্য নয়। অনতিবিলম্বে সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে অনলাইন ক্লাসে ১০০% উপস্থিতি নিশ্চিত করা অথবা অনলাইন ক্লাস বন্ধ করা উচিত।।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

#কলাম/অলটাইমনিউজ/শাহাদাত

Related Post