শিশুরাও খাঁচায় বন্দী

রাজধানী ঢাকা এখন যান্ত্রিক বাতাসে পূর্ণ। এই যান্ত্রিকতার শিকার হচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই। ঢাকার বাহিরের শিশুরা খেলা-ধূলার সুযোগ পায়। কিন্তু ঢাকার শিশুরা অধিকাংশই থাকে গৃহবন্দী। খেলার মাঠ নাই, হারিয়ে যাবার ভয়ে তাদের বাসার বাহিরে যেতে দেয়া হয়না।

স্কুলগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা বিল্ডিং এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পিতা-মাতারা নিরুপায় হয়ে বাসাতেই শিশুকে বন্দী করে রাখে। আমাদের সমাজে অধিকাংশ মায়েরা এখনও বাসার বাহিরে কাজ বা চাকরি করেন না।

দেখা যায়, মা হয়তো রান্না ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু শিশুটি বাসাতে থাকলেও সে কম্পিউটারে, ল্যাপটপ, ট্যাব নিয়ে খেলতে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে এসব যন্ত্র নিয়ে ভিডিও গেম খেলে। যা একজন শিশুর চোখের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। আর স্কুলের পড়াতো আছেই। স্কুলগুলোতে এখন লেখা-পড়ার পাহাড়। চারিদিকে তুমুল প্রতিযোগিতা।

শিশুদের সকালে স্কুল, সন্ধ্যায় হুজুর, তারপর বাসায় শিক্ষক পড়াতে আসেন। বাসার শিক্ষক পড়িয়ে চলে যাবার পর তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাবার জন্য প্রস্তুতি। অনেক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই শিশুকে পড়ায় আবার কিন্ডার গার্ডেন স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির জন্য অনেকেই কোচিং করে। অর্থাৎ সেসব শিশুদের বিকেলের খেলার সময়টাও হারিয়ে যায়।

লেখাপড়ার চাপ এতো বেশি যে, কিছু কিছু পরিবারের পিতা-মাতাও ছেলে-মেয়েদের সাথে পড়তে বসে। রাজধানী ঢাকার স্কুলগুলোর আশে-পাশে দেখা যায়, কিছু সংখ্যক মা স্কুলগুলোর বাইরে স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত বসেই থাকে। রাস্তার জ্যাম ঠেলে বার বার বাসা থেকে যাওয়া আসাটা অসুবিধা, তাই স্কুলের বাইরে রাস্তাতেই বসে থাকতে দেখা যায়।
অনেক শিশুর স্কুল শেষে কোচিং, কোচিং শেষে বাসায় যায়। সকাল বেলাতে বাসা থেকে বের হয়, স্কুল তারপরে কোচিং শেষে রাস্তার জ্যাম ঠেলতে ঠেলতে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এই দৃশ্য হলো নগরী ঢাকার।

ঢাকার বাহিরের শিশুরাও লেখা-পড়ার ভীষণ চাপে থাকে। তবে তারা খেলার সুযোগ পায়, ঢাকার বাইরের শিশুদের খেলার মাঠ আছে। স্কুলগুলোতে ও খেলার মাঠ থাকে। সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে ঢাকার শিশুরা।

তারা স্কুল কোচিং অথবা শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়ে বাসায় ফিরে রাতে মা-বাবা বা শিক্ষকের কাছে আবারো পড়তে বসে, এই হচ্ছে তাদের নিয়তি। খেলার সময় আর ঘুমানের অভাবে মা অথবা বাবার মোবাইল ফোনটা নিয়েই গেম খেলতে থাকে।

নাস্তা হিসেবে খায় ফাস্টফুড। কয়েক বছর আগে বাসায় স্থায়ীভাবে কাজের মানুষ পাওয়া যেত, এখন বাসার কাজের মানুষও তেমন সহজলভ্য নয়। ফলে মায়েরাও অনেক সময় শিশুর টিফিন বা নাস্তার জন্য নিরুপায় হয়ে ফাস্টফুডে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে খেলার মাঠের অভাব, অন্যদিকে নিয়মিত ফাস্টফুডের জন্য অনেক শিশু স্থূলতার সমস্যায় ভুগছে। বছরের পর বছর এই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। পরিণামে শিশুরা অকালেই নিজেকে খুব দ্রুত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের উর্বর ক্ষেত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

পরিবেশ পরিস্থিতি, সুযোগ সুবিধার অভাবে মানুষ সন্তানকে খেলার জন্য ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ট্যাব দিচ্ছে। দৈহিক পরিশ্রমের চেয়ে মানসিক পরিশ্রম হচ্ছে বেশি। এই ধরনের শিশুরা বড় হয়ে একটুতেই হতাশায় ভোগে।

পরীক্ষাতে ভালো নম্বর হয়তো পায় কিন্তু তারা বাস্তববাদী হতে পারেনা। মানুষের সাথে মেশার সুযোগ তাদের হয়না। তাই বাস্তবতা থেকে তারা একটু একটু করে দূরে সরতে থাকে। আর যেসব শিশুরা ছোট বেলা থেকে বিভিন্ন পরিবেশে যায়, বিভিন্ন মানুষের সাথে মেশার সুযোগ পায়, তারা জীবনের বড় ধরনের দুঃখ-কষ্টগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে শেখে।

আমরা রাজধানী ঢাকার পিতা- মাতারা খুব বেশি অসহায়। আমাদের নিরুপায় হয়ে সন্তানদের যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলতে হচ্ছে। লেখা-পড়ার বোঝা, প্রতিযোগিতার তীব্রতা পিতা-মাতাকে বাধ্য করছে শিশুদের যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলার জন্য। বছরের পর বছর এই ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। একটি শিশু এভাবে ডিজিটাল ব্রয়লার শিশুতে পরিণত হচ্ছে। যা কখনোই কাম্য নয়।

এই অবস্থা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদেরকে এই ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাবার জন্য, সরকারকে পাঠ্যসূচীর পরিমাণ আরও কমিয়ে আনতে হবে। বহির্বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে আরও উন্নত হবে, তা চিন্তা করতে হবে।

মিডিয়াগুলোকে আরও বেশি সোচ্চার হতে হবে। গ্রামাঞ্চলের শহরতলীর শিশুরা শহরের শিশুদের জন্য বন্দী জীবন-যাপন করেনা। কিন্তু নগরীর শিশুরা স্বাভাবিক জীবন থেকে খুব বেশি বঞ্চিত। তারা ডিজিটাল ভাবে বড় হচ্ছে, কিন্তু হারিয়ে ফেলছে প্রাণ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে ঢাকার ডিজিটাল শিশুরা অনেকেই সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। যেমন: ড্রইং শেখা, কবিতা আবৃত্তি, গান, নাচ, জুডো ক্যারাতে খেলা। পিতা-মাতাদের উচিৎ তাদের এই শখের কাজগুলোতে মানসিক চাপ না দেয়া। অন্তত শখের কাজে তাদের স্বাধীনতা দেয়া দরকার।

অনেক পিতা-মাতা শিশুদের মেরে, বকাঝকা দিয়ে, চাপ দিয়ে পড়ান যা উচিৎ নয়। এমনিতেই তাদের আমরা মুক্ত বাতাসে খোলা আকাশের নীচে বড় হতে দিতে পারছিনা। হারিয়ে যাবার ভয়, মাদক এর ভয়াবহ আক্রমণ থেকে দূরে সরানোর জন্য আমরা সব পিতা-মাতারা ভীষণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

ব্রয়লার মুরগী যেভাবে খাঁচায় বন্দী থাকে আমাদের শিশুরাও সেভাবেই খাঁচায় বন্দী। নিদিষ্ট সময়ে স্কুল, কোচিং হুজুরের কাছে আরবি পড়া, ফাস্টফুড খাওয়া, ভিডিও গেম, কার্টুন হলো তাদের শখের অন্যতম মাধ্যম।

আমরা যদি আমাদের শিশুদের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে না পারি, তাহলে তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। এই অবস্থা থেকে পিতা-মাতা অভিভাবকদের বের হতে হবে। একটি শিশুকে আমরা যদি সুবিধাভাবে গড়তে পারি, তাহলে সেই শিশুটিই হবে আগামীর কর্ণধার।

আমাদের শিশুরা যেন ব্রয়লার শিশু হয়ে গড়ে না ওঠে, তার দিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। পিতা-মাতা অভিভাবকদের চেষ্টা করতে হবে, আমাদের শিশুদের আমরা যেন লেখাপড়ার চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

ভালো ফলাফলের জন্য বকা-ঝকা বা জোড় করে পড়ানো অনুচিত। তাদের বোঝাতে হবে যে, জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার জন্য লেখাপড়া করা প্রয়োজন। আর ছুটির দিনগুলোতে বাসার মানুষজনকে চেষ্টা করতে হবে, তাদের কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্য, এতে তাদের মন প্রফুল্ল হবে।

চেষ্টা করতে হবে, বিভিন্ন গেম কার্টুনের পরিবর্তে যদি গল্পের বই এ অভ্যস্ত করা যায়, সেটা হবে তাদের জন্য ভীষণ উপকারী এক কাজ। আজকের শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করবার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ডিজিটাল বয়লার শিশু নয়, আমাদের গড়তে হবে সবুজ সরল শিশু।

শিশুদের বানাতে হবে ভবিষ্যতের যোদ্ধা শিশু হিসেবে। আমরা সম্মিলিতভাবে যদি চেষ্টা করি, তাহলে মানুষের মন মানসিকতার পরিবর্তন করা এবং অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো আমাদের পক্ষে সম্ভব।

Related Post