চীনের মুসলিম বন্দিশিবিরে নির্যাতনের নীতিকে সমর্থন দিল পাকিস্তান, কুয়েত, সৌদি সহ ৩৭ দেশ

এশিয়ার পরাশক্তি চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আচরণের প্রশংসা করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবসহ ৩৭টি দেশ। সম্প্রতি জাতিসংঘ বরাবর চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছে তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি সময়ে চিঠির বিষয়টি প্রকাশ্যে এলো যখন ১০ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলিমকে জিনজিয়াংয়ের বন্দিশিবিরে আটক করে সেখানকার শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়েছে বেইজিং।

শুক্রবার (১২ জুলাই) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা ‘রয়টার্সে’র প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের কাছে পাঠানো চিঠিতে সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ মোট ৩৫টি দেশ চীনের উইঘুর নীতির প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। এমনকি চিঠির একটি কপি নিজেদের হাতে আছে বলেও দাবি বার্তা সংস্থাটির।

এর আগে গত বুধবার (১০ জুলাই) উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনা নিপীড়নের বিষয়ে নিন্দা জানিয়েছিল ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও জাপানসহ ২২টি দেশ। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে পাঠানো লিখিত বার্তায় এসব দেশের রাষ্ট্রদূতরা চীনের উইঘুর নীতির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। যদিও দেশটির উইঘুর নীতির প্রতি সমর্থন জানানো রাষ্ট্রগুলোর চিঠিতে জিনজিয়াংয়ে বেইজিংয়ের এই মানবাধিকার লঙ্ঘনকে ‘চীনের অসামান্য অর্জন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

৩৭ দেশের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, চীন নিজ দেশের সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জিনজিয়াংয়ে মৌলবাদ বিরোধী নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে হচ্ছে ‘বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (উইঘুর বন্দিশিবির) স্থাপন’।

চীনকে সমর্থন জানিয়ে লেখা চিঠিতে এও দাবি করা হয়, কর্তৃপক্ষের এসব কর্মকাণ্ডে জিনজিয়াংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আবারও ফিরে এসেছে। সকল জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। গত তিন বছরে অঞ্চলটিতে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঘটেনি। ফলে জনগণ নিরাপত্তার সঙ্গে সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন।

উইঘুর বন্দিশিবির ইস্যুতে চীনকে সমর্থন জানানো চিঠিতে সৌদি আরবসহ অন্য স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হলো- রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, পাকিস্তান, ওমান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, বার্মা, ফিলিপাইন, কিউবা এবং বেলারুশ। তাছাড়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরাও চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেছেন।

পরবর্তীতে চীন কর্তৃপক্ষ থেকে চিঠিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর প্রতি ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চীনে এক রাষ্ট্রীয় সফরকালে দেশটিতে উইঘুর মুসলিমদের মানবাধিকার হরণের পক্ষে প্রথম আওয়াজ তুলেছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বেইজিং সফরকালে ‘সন্ত্রাস ও চরমপন্থা’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে চীনের অধিকার রয়েছে বলে সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি।

এ সময় সন্ত্রাস ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে দেশ দুটির সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। উল্লেখ্য, জিনজিয়াংয়ে বসবাসরত উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে একটি ‘সন্ত্রাস ও চরমপন্থা’র বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে বেইজিং।

বিশ্লেষকদের দাবি, এশিয়ার পরাশক্তি দেশ খ্যাত চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুংয়ের শাসনামলে দেশটিতে কোটি কোটি লোক ক্ষুধা ও নির্যাতনজনিত কারণে প্রাণ হারিয়েছিল। ২০১০ সালে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির গোপন নথির বরাতে একজন বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, মাও সে তুংয়ের শাসনামলে অন্তত চার কোটি মানুষ ক্ষুধা ও নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারায়।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের আগস্টে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির আয়োজিত দুই দিনের বিশেষ সভায় চীনে উইঘুর মুসলিমদের বন্দিশিবিরে আটকে রাখার বিষয়টি উঠে আসে। সভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির জাতিগত বৈষম্য বিষয়ক সংস্থা দাবি করে, চীনে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখের বেশি উইঘুর মুসলিমকে আটকে রাখা হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ স্বায়ত্তশাসিত উইঘুর প্রদেশকে কার্যত ‘বিশাল একটি বন্দিশিবিরে’ পরিণত করেছে।

যার প্রেক্ষিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসংঘের কাছে এ ব্যাপারে নিজেদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুর মুসলিমদের গণহারে আটক এবং নির্যাতনের অভিযোগটি তোলা হয়।
কারা এই উইঘুর মুসলিম?

দেশটির জিনজিয়াং প্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ ভাগই এই উইঘুর মুসলিম। প্রদেশটি তিব্বতের মতো একটি স্বশাসিত অঞ্চল। যে কারণে বিদেশি মিডিয়ার ওপর সেখানে প্রবেশে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। যদিও বেশ কয়েক বছর যাবত বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়, প্রদেশটিতে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ব্যাপক হারে আটক এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

মুসলিম নির্যাতনের দায় কেন চীনের ওপর যাচ্ছে?
সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির কাছে এ ব্যাপারে নিজেদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। যেখানে বলা হয়, উইঘুর মুসলিমদের গণহারে আটক করে সেখানকার বিভিন্ন বন্দিশিবিরে নেওয়া হচ্ছে। এরপর সেখানে তাদের জোরপূর্বক চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য করা হচ্ছে।
এ দিকে নির্বাসিত উইঘুর মুসলিমদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস তাদের প্রতিবেদনে জানায়, সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ কিংবা অভিযোগ ছাড়াই নিরপরাধ উইঘুরদের আটক করা হচ্ছে। এমনকি তাদের জোর করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষেও স্লোগান দিতে বলা হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস আরও জানায়, শিবিরগুলোতে বন্দিদের ঠিকমত খাবার না দিয়ে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। অধিকাংশ বন্দিকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হলেও তাদের কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করা হয় না; এমনকি তাদের কোনো আইনি সহায়তাও প্রদান করে না কর্তৃপক্ষ।

Related Post