ঢাকা মহানগরীর ৩০ লাখ মানুষ জলজট

অল্প বৃষ্টিতেই ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে, লাখ লাখ মানুষ ভুগবে—এটিই গত কয়েক বছরের নিয়মিত চিত্র। অবস্থার উন্নয়নে গত বছর দুটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। কিন্তু প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের গতি কচ্ছপের গতিকেও হার মানিয়েছে। এক বছরে এর একটি প্রকল্পের অগ্রগতি ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, আর ১৪ মাসে অন্য প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র দেড় শতাংশ। প্রকল্প দুটির একটির অনুমোদিত মেয়াদ ২৯ মাস ও অন্যটির ২০ মাস।

প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন গতিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রকল্প পাসের পর নানা ধরনের সমস্যার কারণে শুরুর দিকে বেশি সময় লাগে। পরে প্রকল্পের গতি বাড়ে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের অগ্রগতি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কেন এত সময় লাগছে, তা ওয়াসাই ভালো বলতে পারবে।

ঢাকা ওয়াসার বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প দুটি হচ্ছে ‘ঢাকা মহানগরের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও খাল উন্নয়ন’ এবং ‘হাজারীবাগ, বাইশটেকী, কুর্মিটোলা, মান্ডা ও বেগুনবাড়ি খালে ভূমি অধিগ্রহণ এবং খনন/পুনঃখনন’ প্রকল্প।

খাল উন্নয়ন প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছরের জুলাই মাসে। ৫৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকার এই প্রকল্প আগামী বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পটি সম্পর্কে ওয়াসা বলছে, ঢাকা মহানগরীর পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে ১৫১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৪৪টি খাল, ১০টি বক্স কালভার্ট ও বিভিন্ন সংস্থার কয়েক হাজার কিলোমিটার নালা যুক্ত। তবে এই ব্যবস্থার প্রাথমিক অবকাঠামো হচ্ছে খাল। এর মাধ্যমেই বৃষ্টির পানি নদী পর্যন্ত যায়।

প্রকল্পটির গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াসা বলছে, ঢাকা মহানগরীর খালগুলোর মধ্যে ওয়াসার আওতায় ২৬টি খাল আছে। কিন্তু খালগুলোর অধিকাংশই স্থায়ী অবকাঠামোর মাধ্যমে উন্নয়ন করা হয়নি। ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির সময় পানি দ্রুত বের হতে পারে না। ফলে শহরে জলাবদ্ধতা হয়। এ জন্য এসব এলাকায় নতুন ‘ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক’ সম্প্রসারণ ও খালগুলোর উন্নয়নে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে খালগুলো খননের পাশাপাশি প্রশস্ততাও বাড়ানো হবে। খালের তীর উন্নয়ন করে সেখানে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। এতে প্রকল্প এলাকায় বসবাসরত মানুষের পানিবাহিত রোগের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৬টি খালের ২০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে ১১ কিলোমিটার এবং ৮ কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালা ও ৭ কিলোমিটার সড়ক খনন করা হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি এলাকা জলাবদ্ধতামুক্ত হবে। এলাকাগুলো হচ্ছে দক্ষিণের ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, শংকর, জিগাতলা, রায়েরবাজার এলাকা এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, শেরেবাংলা নগর, দারুস সালাম, মিরপুর, পল্লবী, ক্যান্টনমেন্ট, উত্তরা ও বিমানবন্দর এলাকা। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৫২ লাখ মানুষ বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে।

২৯ মাসের এই প্রকল্প অনুমোদনের পরবর্তী এক বছরে (গত জুন) অগ্রগতি মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। ফলে শিগগিরই প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকার মানুষের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

অন্যদিকে ‘হাজারীবাগ, বাইশটেকী, কুর্মিটোলা, মান্ডা ও বেগুনবাড়ি খালে ভূমি অধিগ্রহণ এবং খনন/পুনঃখনন’ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছরের এপ্রিল মাসে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, অধিগ্রহণ করে খননের মাধ্যমে খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়ালে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি ও গৃহস্থালি বর্জ্যসহ পানি সহজেই খাল দিয়ে নদীতে নিষ্কাশিত হবে।

ওয়াসা জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা মহানগরীর ৩০ লাখ মানুষ জলজট থেকে রক্ষা পাবে।

প্রকল্পটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাইশটেকী খালের ভাটিতে এবং হাজারীবাগ খালের উজান ও ভাটিতে একটি করে নতুন খাল খনন করা হবে। বাইশটেকী খালের ভাটিতে খাল খননের জন্য ৬ দশমিক ৩৮ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯৬ কোটি টাকা।

হাজারীবাগে খাল খননের জন্য ৪ দশমিক ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। কুর্মিটোলা খালের জন্য ৪ দশমিক ৬১ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, এতে ব্যয় হবে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বেগুনবাড়ি খালের জন্য প্রায় দুই একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হবে ৩৭ কোটি টাকা। এসব জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে জমির মালিকদের ভবন ও ঘরবাড়ির ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হবে ২৫ কোটি টাকা। ২০ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পের ১৪ মাসে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র দেড় শতাংশ।

প্রকল্প দুটির বাস্তবায়নের ধীরগতি সম্পর্কে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংবাদ সম্মেলন করে প্রকল্প দুটির ব্যাপারে জানানো হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

Related Post